ইরানের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটেছে এক রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্য দিয়ে। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে তেহরানের কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৮৬ বছর বয়সী এই সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে।
খামেনির মৃত্যুর মাধ্যমে শুধু একজন নেতার বিদায়ই নয়, বরং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের শাসনব্যবস্থাও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট থাকা সত্ত্বেও কেন খামেনিই পশ্চিমা শক্তির প্রধান লক্ষ্য ছিলেন—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে বিশ্লেষণ।
ইরানের শাসনব্যবস্থা অন্যান্য দেশের তুলনায় ভিন্নধর্মী। দেশটিতে প্রেসিডেন্ট ও সংসদ সদস্যরা নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হলেও প্রকৃত ক্ষমতা থাকে ‘সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা’ বা সুপ্রিম লিডারের হাতে। রাষ্ট্রীয় নীতি, সামরিক সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকে এই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির কাছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত দেশটি মাত্র দুজন সুপ্রিম লিডার পেয়েছে, যাদের পদবি আয়াতুল্লাহ—যা শিয়া মুসলিমদের কাছে জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতার মর্যাদা নির্দেশ করে।
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলি খামেনি। স্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা শেষে তিনি শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৬২ সালে তিনি শাহবিরোধী আন্দোলনে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীতে পরিণত হন। খামেনি পরবর্তীতে দাবি করেছিলেন, তার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চিন্তাধারার মূল উৎস ছিলেন খোমেনি।
ইসলামি বিপ্লবের পর ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন খামেনি। এই পদে থেকে তিনি ছিলেন দেশটির সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের প্রধান কর্তৃপক্ষ।
পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন—ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো মূলত তার অনুমোদনেই বাস্তবায়িত হতো। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিতে ইরানের প্রশাসনিক কাঠামোর চেয়েও খামেনির ব্যক্তিগত ভূমিকা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী।
তার দীর্ঘ শাসনামল কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও কট্টর নীতির জন্য আলোচিত ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে।
১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করলেও তা বড় অগ্রগতি পায়নি। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশজুড়ে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়, তা দমনেও কঠোর অবস্থান নেন খামেনি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটে।
২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য ও পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার অবস্থান তাকে পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনিকে “ইতিহাসের অন্যতম কঠোর নেতা” উল্লেখ করে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতেই এই যৌথ হামলা চালানো হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় উত্তরসূরি নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত সামনে আসেনি।
বর্তমান সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাতে সীমিত নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও সর্বোচ্চ নেতার শূন্যস্থান পূরণ করা ইরানের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা