বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো যেসব ইশতেহার বা নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছে, সেগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ আসলে কী বার্তা পাচ্ছে? ভোটারদের জন্য আসলেই কি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে, নাকি এগুলো শুধুই নির্বাচনী প্রচারণার অংশ?
বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ ছোট-বড় দলগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের পরিকল্পনা ভোটারদের সামনে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের তৎপরতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক ইশতেহারে নতুন কিছু বক্তব্য দিয়ে ভোটার আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবুও অনেক প্রতিশ্রুতি আবার দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর তালিকায় ছিল, যা তারা ক্ষমতায় থেকেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এছাড়া, অধিকাংশ দলই তাদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কৌশল বা সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ইশতেহারে তুলে ধরেনি। তবে প্রায় সব দলের ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে।
বিএনপির ইশতেহার:
এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক কার্ড ও কৃষি বীমা, এক লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ, শিক্ষাক্ষেত্রে মধ্যাহ্নভোজ, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। মোট ৫১টি বিষয়ের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ ও নারী সংরক্ষণ, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, জুলাই হত্যার বিচার, গণ-অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে কর্মসংস্থান, আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান, বেকারভাতা ও পেনশন ফান্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী:
ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২৬টি অগ্রাধিকারবিষয় এবং ৪১ দফার প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করা হয়েছে। নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র, মাতৃত্বকালীন সময়ে কর্মঘণ্টা কমানো এবং দুই ভাগে সাত কোটি কর্মক্ষম যুবকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। তবে বিশ্লেষকরা বলেন, অতীতের অবস্থান ও ধর্মভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর সমঅধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
এনসিপি:
জাতীয় নাগরিক পার্টি তাদের ৩৬ দফা ইশতেহারে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিচার, ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা, এক কোটি কর্মসংস্থান, ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, সংসদে সংরক্ষিত আসন, মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, সরকারি চাকরিতে ডে-কেয়ার সুবিধা ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন:
চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন দল রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়ার প্রাধান্যসহ ৩০ দফা মৌলিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচন, কার্যকর সংসদ, প্রজাতান্ত্রিক পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া ১২টি বিশেষ কর্মসূচি, ৮ দফা নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কারের ৬ দফা পরিকল্পনা এবং খাতভিত্তিক ২৮টি উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষক মত:
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভোটারদের প্রত্যাশাকে বিবেচনায় রেখে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই। নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, নির্বাচনের আগে ইশতেহারের চর্চা যেমন আছে, তেমনি পরবর্তীতে তা কার্যকর না হওয়ার অভ্যাসও রয়েছে। এবারও নতুন ও পুরনো অনেক প্রতিশ্রুতির সমাহার আছে, তবে অর্থায়ন, দক্ষতা ও সততার প্রশ্ন এখনও মেঝে রয়ে গেছে।