মেরাজ শব্দের অর্থ ‘ঊর্ধ্বগমন’। ইসলামী পরিভাষায় মেরাজ হলো ইসলামের সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) কর্তৃক সশরীরে, সজ্ঞানে এবং জাগ্রত অবস্থায় করা অতুলনীয় রাত্রিভ্রমণ। হজরত জিবরাইল (আ.) ও হজরত মিকাইল (আ.)-এর সঙ্গে বিশেষ বাহন বোরাকের মাধ্যমে প্রথমে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা, তারপর প্রথম আসমান থেকে একে একে সপ্তম আসমান হয়ে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত ভ্রমণ এবং সেখান থেকে একাকী রফরফ বাহনে আরশে আজিম পর্যন্ত পৌঁছে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ ও জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করাই মেরাজ।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"তিনি পবিত্র (আল্লাহ) যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।" (সুরা বনি ইসরাইল : ১)
মেরাজে নবীজির (সা.) সঙ্গে অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তির সাক্ষাৎ ঘটেছে এবং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তও এই যাত্রার মাধ্যমে এসেছে। চলুন জেনে নিই, কাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মেরাজ সফরে।
হিজরতের পূর্ববর্তী সময়ের কথা। এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে ইশার নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি খানায়ে কাবা সংলগ্ন ‘হাতিমে’ শুয়ে বিশ্রাম নেন। সেই সময়ে হজরত জিবরাইল (আ.) নেমে এসে নবীজিকে জাগ্রত করেন এবং তাঁকে আবে জমজমের নিকটে নিয়ে যান। সেখানে নবীজির (সা.) বক্ষের অগ্রভাগ থেকে চুল পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হয়। তার হৃৎপিণ্ড বের করে আবে যমজম দ্বারা শোধন করা হয় এবং ঈমান ও প্রজ্ঞায় ভরপুর স্বর্ণের একটি পেয়ালা দিয়ে তা পূর্ণ করা হয়। এরপর হৃৎপিণ্ড যথাস্থানে রেখে উপরিভাগ সেলাই করে দেওয়া হয়।
হজরত আনাস (রা.) বলেন, “আমি নবীজির (সা.) বুকে এর চিহ্ন নিজ চোখে দেখেছি।”
মেরাজের এই ঘটনা নবীজির (সা.) জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিক, যা ইসলামের শিক্ষা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
মেরাজের ঐতিহাসিক সফরে রাসুলুল্লাহ ﷺ–কে আল্লাহ তায়ালা ‘বুরাক’ নামক এক দ্রুতগামী বাহনে আরোহণ করান। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি পৌঁছে যান জেরুজালেমের বায়তুল মাকদিসে। সেখানে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, একাধিক নবী নামাজে রত। তাঁদের মধ্যে হজরত মুসা (আ.) ছিলেন দীর্ঘদেহী ও ছিপছিপে গড়নের। তাঁর চুল ছিল কোঁকড়ানো ও কান পর্যন্ত ঝুলন্ত—দেখে ‘শানওয়া’ গোত্রের একজন ব্যক্তির কথা মনে হয়। হজরত ঈসা (আ.)-কে দেখা যায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে। তিনি ছিলেন মাঝারি গড়নের, উজ্জ্বল সাদা-লাল বর্ণের অধিকারী এবং তাঁর চুল ছিল সোজা ও চকচকে। তাঁর চেহারার সঙ্গে সাহাবি উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফি (রা.)-এর বিশেষ সাদৃশ্য ছিল। একইভাবে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কেও নামাজরত অবস্থায় দেখা যায়।
এরপর জামাত অনুষ্ঠিত হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইমামতি করেন এবং সকল নবী-রাসুল তাঁর পেছনে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে বের হয়ে তিনি দেখেন, হজরত জিবরাইল (আ.)-এর হাতে দুটি সুন্দর পাত্র—একটিতে দুধ, অন্যটিতে শরাব। পাত্র দুটি পেশ করা হলে নবী ﷺ দুধের পাত্রটি গ্রহণ করেন। তখন জিবরাইল (আ.) বলেন, “আপনি ও আপনার উম্মত ফিতরাত তথা স্বভাবজাত সঠিক পথকেই বেছে নিয়েছেন। আপনি যদি শরাব গ্রহণ করতেন, তবে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত।”
এরপর শুরু হয় ঊর্ধ্বজগতের মহাসফর। নবী কারিম ﷺ বুরাকের উপর আরোহী অবস্থায় একে একে আকাশসমূহ অতিক্রম করেন। প্রতিটি আকাশের দরজায় জিবরাইল (আ.)-এর পরিচয় ও নবী ﷺ-কে আনার অনুমতি চাওয়ার পর দরজা খুলে দেওয়া হয়।
প্রথম আকাশে তিনি হজরত আদম (আ.)-এর সাক্ষাৎ পান। তাঁর ডান ও বাম পাশে অসংখ্য আত্মা ছিল। ডানদিকে তাকালে তিনি হাসতেন, আর বামদিকে তাকালে কাঁদতেন। জিবরাইল (আ.) জানান, ডানদিকে থাকা আত্মারা জান্নাতি এবং বামদিকে থাকা আত্মারা জাহান্নামি।
দ্বিতীয় আকাশে নবী ﷺ সাক্ষাৎ পান হজরত ঈসা (আ.) ও হজরত ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া (আ.)-এর সঙ্গে। তৃতীয় আকাশে হজরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আকাশে হজরত ইদরিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হজরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.) এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। প্রত্যেক নবীই রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও দুআ জানান।
এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘সিদরাতুল মুনতাহা’-য়—যেখানে পৃথিবী থেকে ঊর্ধ্বগামী এবং ঊর্ধ্বজগত থেকে অবতরণকারী সব কিছুর সীমা নির্ধারিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেন, এ বৃক্ষের পাতা ছিল হাতির কানের মতো বিশাল এবং ফল ছিল বড় মটকার আকৃতির। আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নির্দেশে এ বৃক্ষ এমন সৌন্দর্যে সজ্জিত হয়, যা মানব ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব।
সিদরাতুল মুনতাহার ঊর্ধ্বে এমন এক স্থানে তিনি পৌঁছান, যেখানে আল্লাহর নির্দেশ লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাদের কলমের শব্দ তিনি শুনতে পান। সেখানেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী ﷺ-কে প্রয়োজনীয় বিধান ও অনুগ্রহ দান করেন।
তথ্যসূত্র: তিরমিজি, মুসলিম, বোখারি, মুসনাদে আহমাদসহ হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ।
লেখক: সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ
মুহতামিম: জামিয়াতুল কোরআন, ঢাকা