অনলাইন নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৫ আগস্ট একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিতর্কিত তারিখ। ১৯৭৫ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। একই তারিখে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন হওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন মাত্রা পায়।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন খালেদা খানম, যিনি পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া নামে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফেনী। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনাকর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দীর্ঘদিন তিনি রাজনীতির সরাসরি কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থেকে একজন গৃহিণী ও নিভৃতচারী জীবনযাপন করেন।
তবে স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮০-এর দশকে তাঁর জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। ১৯৮২ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি পরিচিতি পান ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবেও তিনি ইতিহাসে স্থান করে নেন। তাঁর প্রথম মেয়াদে নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং মেয়েদের শিক্ষায় বিভিন্ন প্রণোদনামূলক পদক্ষেপসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা তাঁকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
তবে ১৫ আগস্টের সঙ্গে তাঁর জন্মদিনের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে কেক কেটে তাঁর জন্মদিন পালন করত। অন্যদিকে একই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস পালিত হওয়ায় এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সাল থেকে খালেদা জিয়ার জন্মদিনে মধ্যরাতে কেক কাটার আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ করে বিএনপি। এর পরিবর্তে দোয়া, মিলাদ ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালনের প্রবণতা দেখা যায়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন তাই শুধু একজন গৃহিণীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে পৌঁছানোর গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারার দীর্ঘ সংঘাতের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
একই তারিখে জন্মদিন ও জাতীয় ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সহাবস্থান ১৫ আগস্টকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশেষ ও জটিল প্রতীকে পরিণত করেছে। আর সাধারণ গৃহিণী থেকে রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসা বেগম খালেদা জিয়ার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।