১৯৬৯ সালের ১৮ এপ্রিল, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছিল এক আলোচিত প্রতিবেদন, শিরোনাম—‘Pakistan: Prophet of Violence.’
সেই প্রতিবেদনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে যে মানুষটিকে ‘প্রোফেট অব ভায়োলেন্স’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, তিনি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের চোখে তিনি তখন ছিলেন এক বিদ্রোহী ধর্মগুরু, যিনি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভাসানী কি সত্যিই ‘প্রোফেট অব ভায়োলেন্স’ ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন এক বঞ্চিত জাতির অন্তর্নিহিত ক্ষোভ ও মুক্তির প্রতীক?
‘টাইম’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভাসানীর আহ্বানে এবং তার নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে যে বিক্ষোভ ও ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পতনের পথ তৈরি করে। লেখায় তাকে চিত্রিত করা হয়েছিল এক তেজস্বী, প্রায় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে, যিনি দরিদ্র কৃষক-শ্রমিকের ভাষা ও ক্ষোভকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিয়েছিলেন। ‘Prophet of Violence’ শব্দগুচ্ছটি তাই যতটা নিন্দাসূচক মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল ভীত পশ্চিমা দৃষ্টির প্রতিফলন; যেখানে বঞ্চিত মানুষের সংগঠিত দাবি বিপ্লবের চেয়ে ‘হিংসা’ বলেই বেশি ভয়ংকর মনে হয়েছিল।
ভাসানীর রাজনীতি বোঝার জন্য আমাদের ফিরতে হয় তার জীবনের শুরুতে। টাঙ্গাইলের সান্তাহার থেকে উঠে আসা এ মানুষটি শৈশবেই দেখেছিলেন অনাহার, অন্যায় ও ঔপনিবেশিক শাসনের বৈষম্য। ধর্মীয় শিক্ষা তাকে দিয়েছে ত্যাগের আদর্শ, কিন্তু সমাজের বাস্তবতা তাকে শিখিয়েছে প্রতিবাদের ভাষা। রাজনীতিতে তার প্রবেশ ঘটে ১৯২০-এর দশকে, কিন্তু তার রাজনৈতিক সত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে পাকিস্তান আন্দোলনের সময়। মুসলিম লীগের প্রথম দিকের নেতাদের একজন হয়েও ভাসানী ছিলেন ব্যতিক্রম—তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন, পাকিস্তান গঠনের পরও বাঙালির মুক্তি আসবে না। ধর্মীয় পরিচয় নয়, অর্থনৈতিক শোষণই হবে আসল বিভাজনের রেখা।
এ উপলব্ধিই তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় কৃষক-শ্রমিক রাজনীতির দিকে। তার ১৯৪৯ সালে গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিল মূলত সাধারণ মানুষের রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম। সেই দলই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে বাঙালির স্বাধীনতার রাজনৈতিক বাহন। কিন্তু ভাসানী ছিলেন সবসময়ই স্রোতের বিপরীতে। অসাম্প্রদায়িক এ মানুষটি আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেন, তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, বলেন কৃষকের রাষ্ট্রের কথা। রাজনীতির প্রচলিত প্রটোকল তার ছিল না, আবার ক্ষমতার কোনো মোহও ছিল না।
১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান আরও তীব্র হয়। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের একমাত্র জননেতা, যিনি অবিচারের বিরুদ্ধে রাস্তা দখলকে বৈধ প্রতিরোধের রূপ দিয়েছেন। তার ভাষণ, তার আচরণ, এমনকি তার পোশাকও হয়ে উঠেছিল প্রতীক—নিম্নবিত্তের প্রতিনিধিত্বের এক দৃশ্যমান ভাষা। তাকে ‘মওলানা’ বলা হলেও তার রাজনীতি ধর্মীয় চৌহদ্দি ছাড়িয়ে গিয়েছিল বহুদূর; তিনি ছিলেন বিশ্বাসী, কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল মানুষের মুক্তিতে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ভাসানীর ভূমিকা ছিল প্রেরণার। তার উচ্চারণ—‘তুমি ভয় পেয়ো না, লড়াই করো’ ছিল আন্দোলনের নৈতিক জ্বালানি। সেই সময়কার পত্রপত্রিকাগুলোতে দেখা যায়, দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত ভাসানীর অনুসারীরা হরতাল ও বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে এটি ‘হিংসা’ হিসেবে প্রতিভাত হয়, কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি ছিল এক গণআন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ, যার পেছনে ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভ।
তার সমালোচকরা বলেন, ভাসানী ছিলেন এক চরমপন্থি, যিনি সর্বদা সংঘর্ষে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তার কাছের লোকজন তাকে দেখেছেন এক দূরদর্শী মানুষ হিসেবে, যিনি জানতেন ‘সংঘর্ষ’ মানেই হিংসা নয়। বরং, এটি সামাজিক পরিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া। তিনি বলেছিলেন, ‘জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা পাপ নয়, বরং পাপ হলো চুপ করে থাকা।’ এ একটি বাক্যেই ধরা পড়ে তার রাজনীতির সারমর্ম—ভয়হীনতা, প্রতিবাদ আর মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
ভাসানীকে বোঝার আরেকটি উপায় হলো তাকে সময়ের রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করা। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী কিংবা মুজিব—সবাই কোনো না কোনো সময় রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হয়েছেন বা হতে চেয়েছেন। কিন্তু ভাসানী সেদিক থেকে একেবারেই অন্য ধরনের নেতা। তিনি ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চাননি; বরং বারবার ক্ষমতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নয়, বরং মানুষের ক্ষমতায়নই আসল কাজ। এজন্যই তাকে বলা যায় বাংলাদেশের রাজনীতির এক ‘নৈতিক কম্পাস’।
১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে তার ‘বিদায় পশ্চিম পাকিস্তান’ ভাষণ অনেকের কাছে ছিল বিভাজনমূলক। কেউ কেউ তাকে পাকিস্তান ভাঙার প্রথম প্রবর্তক বলেছিলেন। আবার স্বাধীনতার পরপরই চীনপন্থি রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পর্কও সৃষ্টি করেছিল বিভ্রান্তি। কিন্তু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এসব ঘটনাই তাকে আরও অনন্য করে তোলে। তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি জনগণের জন্য সত্য উচ্চারণ করতে ভয় পাননি।
‘Prophet of Violence’—এ শব্দযুগলের মধ্যে তাই যতটা তাচ্ছিল্য, তার চেয়ে অনেক বেশি ইতিহাসের কৌতূহল আছে। এক অর্থে, এটি ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনকে সংক্ষিপ্তভাবে সংজ্ঞায়িত করে। তার ‘হিংসা’ ছিল প্রতীকী, ছিল প্রতিরোধের ভাষা। ১৯৬৯ সালে যখন গোটা পাকিস্তান উত্তাল, তখন ভাসানী ছিলেন সেই প্রবীণ নেতা, যিনি তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন ভয়হীনভাবে প্রতিবাদ করতে।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ভাসানীকে মনে করা মানে কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নয়, বরং আমাদের রাজনীতির অন্তর্গত সংকটগুলো নতুন করে ভাবা। আজ যখন রাজনীতি আবারও ক্ষমতা ও বাণিজ্যের দখলে, তখন ভাসানীর কৃষক-শ্রমিকনির্ভর রাজনীতির ভাষা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তার মতো মানুষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতি মানে কেবল দল বা নির্বাচনের প্রতিযোগিতা নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এবং সাহসের প্রশ্ন।
ভাসানী ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি মৃত্যুকেও ভয় পাননি। একবার বলেছিলেন, ‘আমি ফাঁসির রশিকেও স্বাগত জানাব, যদি তাতে মানুষের মুক্তি আসে।’ তার এ আত্মত্যাগের প্রস্তুতি তাকে করে তুলেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য প্রতীকে।
‘টাইম’ ম্যাগাজিনের দেওয়া ‘Prophet of Violence’ শিরোনাম তাই যতটা নেতিবাচক, ততটাই এক স্বীকৃতি—বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হতে পারার স্বীকৃতি। তার জীবন আমাদের শেখায়, সত্যিকারের নেতার কাজ হলো ঝড় তোলা, প্রশ্ন তোলা আর মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো। ভাসানী হয়তো রাষ্ট্রশক্তিকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু তার রাজনীতি ধ্বংসের ছিল না, ছিল মজলুমের পক্ষে মুক্তির লড়াই।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ক্ষমতার কেন্দ্রে না থেকেও মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালানো যায়, ন্যায়ের পক্ষে স্বপ্ন দেখানো যায়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে সংগঠিত করা যায়। ‘Prophet of Violence’ নামের আড়ালেই তাই বহন করে এক গভীরতর পরিচয়—নিপীড়িতের পথপ্রদর্শক। সে কারণেই রাজনৈতিক ইতিহাসের অপরিহার্য পাঠে মজলুম জননেতা ভাসানী চিরদিন থেকে যান এক আলোকবর্তিকার মতো।