অনলাইন নিউজ ডেস্ক
সরকার ও বিরোধী দলের লোকদেখানো বিরোধিতার রাজনীতি জনগণ দেখতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, মানুষকে দেখানোর জন্য সরকারি ও বিরোধী দল কানামাছি খেলবে, লোকদেখানো বিরোধিতা করবে, আবার রাতে বসে সমঝোতা করবে—বাংলাদেশের জনগণ এমন রাজনীতি দেখতে চায় না।
ঈমান-আকিদা সংরক্ষণে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান ক্রান্তিকালে ঈমান-আকিদা রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় বা আপস করা যাবে না।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের আলেম-ওলামাদের ভোট নির্বাচনের আগে প্রয়োজন, কিন্তু নির্বাচনের পর তাদের প্রয়োজন নেই—সরকার যেন এমনটি মনে না করে। হকের বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। সরকার ও বিরোধী দলসহ সবাইকে তাদের মতামত বুঝতে হবে।
হেফাজতে ইসলামের এক নেতার প্রতি ইঙ্গিত করে মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ ওলামায়ে কেরামের মতের ভিত্তিতে যে নেতৃত্ব তৈরি হবে, তারা সেই নেতৃত্বকে স্বাগত জানাবেন। তবে পশ্চিমা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার চুক্তির বিরোধিতা করতে না দেওয়া বা ভিন্ন মতাদর্শের সঙ্গে আপস করে যে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিকে তারা নেতৃত্ব হিসেবে মেনে নিতে পারবেন না।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম শায়েখে চরমোনাই বলেন, ক্ষমতায় গেলে কোনো সরকারই যেন মনে না করে তারা স্থায়ী হয়ে গেছে এবং তাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কেউ নেই। এমন চিন্তাই আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বিএনপি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামিতার মতো বিষয় বাস্তবায়ন কিংবা ইসলামী আকিদার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে দেশের তৌহিদি জনতা চুপ থাকবে না।
হিজবুত তাওহীদ নিষিদ্ধ না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, সংগঠনটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার কেন উদ্যোগ নিচ্ছে না, তা স্পষ্ট নয়।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, কয়েক মাস ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকার জনগণের জন্য কী করেছে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ট্যাক্স ও ভ্যাটের দাম বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগও তোলেন তিনি।
মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে ফয়জুল করীম বলেন, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক। ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি ও ধর্ষণ বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকার যদি এসব বিষয়ে কর্ণপাত না করে এবং ওলামায়ে কেরামের বক্তব্যকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে সরকারের ভবিষ্যৎ ভালো হবে না।
কনভেনশনে ইসলামী চিন্তাবিদ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, লা-মাজহাবি মতাদর্শের কাউকে সরকার যেকোনো পর্যায়ে দায়িত্ব দিতে পারে, তবে ধর্মমন্ত্রী হিসেবে তাকে তারা মেনে নেবেন না।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, তাদের আন্দোলন ও কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হক ও হক্কানিকে প্রতিষ্ঠিত রাখা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার বাইরে কোনো কিছু গ্রহণ করা হবে না বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে যেসব বিষয়ে তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রক্ত দিয়েছেন, সেসব বিষয়ে বর্তমান সরকারের আমলে আবার মাঠে নামতে হলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। ইসলামী মূল্যবোধের সরকার কিংবা জাতীয়তাবাদী সরকার—যে নামেই সরকার হোক, দাবি উপেক্ষা করা হলে তারা আবারও রাজপথে নামবেন।
কনভেনশনের সভাপতি মাওলানা আব্দুল আওয়াল বলেন, বিভিন্ন বাতিল ফেরকার বিরুদ্ধে শুধু সেমিনার বা মহাসমাবেশ করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। হিজবুত তাওহীদের মতো সংগঠন নিষিদ্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে তিনি সরকারের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতার সমর্থন নিয়ে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এরপরও তাদের দাবি উপেক্ষা করা হলে তারা চুপ করে বসে থাকবেন না। প্রয়োজন হলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের ঘোষণা দেন তিনি।
কনভেনশনে পাকিস্তানের কারকাজ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের পরিচালক মাওলানা ইলিয়াস গুম্মান বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুফতি লুৎফর রহমান ফরায়েজী, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা শায়েখ সাজিদুর রহমান, আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলিপুরী, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী মোমেনশাহী ও বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেকসহ বিশিষ্ট আলেম ও নেতৃবৃন্দ।