অভাব থামাতে পারেনি স্বপ্ন — অভাব থেকেই পরিকল্পনা, দেশ-মহাদেশ পেরিয়ে এবার Antarctica
এক স্কুলমাস্টারের ছেলের অবিশ্বাস্য যাত্রা,বদলে দেওয়া এক জীবনের গল্প।


ভ্রমণকারী সালাহউদ্দিন সুমন তার অসাধারণ সফলতার গল্প এবং তার এই অগ্রযাত্রায় যারা সহযোগিতাকারীদের-কে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে নিজের ভেরিফাইড ফেইসবুক আইডিতে বিস্তারিত শেয়ার করেছেন, যা হুবহু আমরা পাঠকদের জন্য প্রকাশ করেছি।

অবশেষে পা রাখলাম অ্যান্টর্কটিকার মাটিতে। মাটি বললে অবশ্য খানিক ভুলই হয়, কারণ এখানে চারিদিকে বরফে আবৃত। বগুড়া জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের স্কুল মাস্টারের সন্তান হিসেবে অ্যান্টার্কটিকা পর্যন্ত চলে আসাটা অভাবনীয়ই বটে। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এক সন্তান হিসেবে লেখাপড়া শেষে জীবন চলার মতো সম্মানজনক একটি চাকরি আর বছরে দুই/এক বার কক্সবাজার-বান্দরবান, বড়জোর কাঠমণ্ডু-কোলকাতা যেতে পারলেই হয়তো ঠিকঠাক ছিলো আমার জন্য।
সেই আমি উত্তাল আটলান্টিক পেরিয়ে চলে এসেছি অ্যান্টার্কটিকায়। তুষারের ওপর পেঙ্গুইনদের হাঁটাহাঁটি, সিলদের ছোটাছুটি আর জমে যাওয়া সাগরের শান্ত জলে হাম্পব্যাক তিমিদের দাপাদাপি দেখছি নিজ চোখে। এ যেনো রীতিমতো অবিশ্বাস্য!
জীবনের কোনো পর্যায়েই নিজেকে আমার কখনোই অসুখী মনে হয়নি। যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, প্রথম বর্ষ থেকেই সাংবাদিকতা করতাম। পত্রিকা থেকে টাকা দিতো না কিছুই, উল্টো খরচ। শিক্ষক বাবাও সাধ্যের মধ্যে যা পাঠাতেন তা দিয়ে মাস চলতো না মোটেই। এমন অনেক দিন গেছে, দুই/এক বেলা না খেয়ে থেকেছি। রাজশাহী শহরের জিরো পয়েন্টের একটি হোটেলে আমি প্রায়ই যেতাম। ওখানে ১০টাকায় দুপুরের খাবার পাওয়া যেতো। ৫ টাকার এক প্লেট ভাত আর ৫ টাকার করলা-আলুর ভাজি, সাথে পাতলা ডাল ফ্রি। আমার বন্ধু, সহপাঠী সাংবাদিক মেহেরুল সুজনও এই হোটেলে মধ্যাহ্নভোজে যোগ দিতো মাঝেসাঝেই।
সেই অভাবের সময়েও নিজেকে একরত্তি অসুখী মনে হয়নি আমার। পরে যখন দেশ টিভিতে রাজশাহী ডিভিশনাল করিসপন্ডেন্ট হিসেবে জয়েন করলাম, তখন বেতন ছিলো ১২ হাজার। ওই সময় ওই টাকাই আমার কাছে ছিলো বিরাটকিছু। সময় টিভিতে রাজয়াহী ব্যুরোতে জয়েন করি মালিক ২০ হাজার টাকায়।
২০১৩ সালে ঢাকায় চলে এসেছি। ধীরে ধীরে চাকরিতে প্রমোশন হয়েছে, বেতন বেড়েছে। যখন যা বেতন পেতাম আমার জীবনযাত্রাও ছিলো সেই মানের। কখনো মনেই হয়নি আমার এর চেয়ে বেশিকিছু দরকার।
এক সময় বেতন বাড়ার সাথে সাথে মাথায় ভিন্ন এক দুঃশ্চিন্তা ভর করলো। ভাবলাম, এই বেতনে তো অফিস ৫/৭জন নতুন লোক নিতে পারে অনায়াসেই। কোনো দিন যদি ছাঁটাইয়ের কাঁচিতে পড়ে যাই তখন কী হবে?
এই ভাবনা থেকেই দ্বিতীয় কোনো আর্থিক সোর্সের কথা ভাবতে শুরু করি এবং ইউটিউবিং করার সিদ্ধান্ত নিই। পরে নানান ঘটনার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা ছেড়ে এখানেই থিতু হই। সত্যি কথা বলতে, সাংবাদিকতা ছাড়ার সিদ্ধান্তটাই আমার জীবন বদলে দিয়েছে।
চাকরি ছাড়ার সাহস না করলে আজ আমি অ্যান্টার্কটিকায় আসতে পারতাম না। এমন অভিযানে আসতে ধনাঢ্য ব্যক্তিদেরও হাঁটু কাঁপে। আমি তো নিছক চুনোপুটি।
তার্কিশ এয়ারলাইন্স আমার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এয়ারলাইন্সটির কান্ট্রি ম্যানেজার জনাব İslam Güre এর উদ্যোগ ও আন্তরিকতায় অধরাকে ধরতে পারছি। এয়ারলাইন্সটির কর্মকর্তা Ejaz Kadry এর সার্বিক সহায়তা, তৎপরতা সবকিছু সহজ করে দিয়েছে।
গুগল ম্যাপে অ্যান্টার্কটিকা জুম করে করে দেখতাম। সেই সময় ভুলেও ভাবিনি এখানে আমি কখনো পা রাখবো।

ব্যয়বহুল এই অভিযানে স্পন্সর করেছে ডট ইন্টারনেট। আমি কী প্রমোশন করবো আর প্রতিষ্ঠানের কী লাভ হবে, সেই হিসাব না কষেই, একদম ভালোবাসার জায়গা থেকে আমাদের এই ট্রিপে স্পন্সর করেছেন ডট ইন্টারনেটের প্রদীপ দা।
যাদের সহায়তায় আমি আর নিলয় আজ অ্যান্টার্কটিকায়, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা অশেষ🙏💕



