তিন দিনের সফরে রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির
জ্বালানি, বাণিজ্য, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক ইস্যুতে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা; খলিলুর রহমান ও হুমায়ুন কবিরের মস্কো সফরে ঢাকা-মস্কো সম্পর্কের নতুন গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা।


পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আগামী রোববার তিন দিনের সরকারি সফরে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু, জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতি নিয়ে আলোচনা হবে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। সফরকালে খলিলুর রহমান ও হুমায়ুন কবির রুশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেবেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
মস্কোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার বহুমাত্রিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে সফরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে ঢাকা ও মস্কোর সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রকল্পটির অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কারিগরি ও আর্থিক বিষয় সফরের আলোচ্যসূচিতে গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ খাত, শিল্প সহযোগিতা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনায় স্থান পাবে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আরোপিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিকল্প অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্যিক লেনদেনের সুযোগ এবং পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া জাতিসংঘ, বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরে খলিলুর রহমান ও হুমায়ুন কবিরের উপস্থিতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন অগ্রাধিকারকে সমন্বিতভাবে তুলে ধরবে। একদিকে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক কৌশলগত পরামর্শ—দুই ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্ব থাকায় সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
উল্লেখ্য, সাত বছর পর বাংলাদেশের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটি প্রথম মস্কো সফর। এর আগে ২০১৯ সালের এপ্রিলে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন রাশিয়া সফর করেছিলেন। পরে ২০২৩ সালে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ঢাকা সফর করেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের সফরকে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে তাঁকে একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও বাস্তববাদী কূটনীতিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা এবং সমঝোতা তৈরির সক্ষমতার প্রশংসা করা হয়।
রাশিয়া আশা প্রকাশ করেছে, তাঁর নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের গতি বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি খলিলুর রহমান ও হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে মস্কো।



