

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের শুরুতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছরের মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন ধরিয়েছেন। একের পর এক আক্রমণাত্মক ও একতরফা সিদ্ধান্তে তিনি বিশ্বরাজনীতিকে নজিরবিহীন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের মেয়াদ শেষে বিশ্ব হয়তো আগের পরিচিত কাঠামোতেই আর থাকবে না।
আগামী জুনে ৮০ বছরে পা রাখতে যাওয়া এই রিপাবলিকান নেতা নতুন বছরের শুরু থেকেই যুদ্ধংদেহী অবস্থান নিয়েছেন। ৩ জানুয়ারি তাঁর নির্দেশে তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালানো হয়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হন এবং দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ নিকোলা মাদুরোকে আটক করে নিয়ে যায় মার্কিন বিশেষ বাহিনী।
ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর থেকে শত্রু–মিত্র নির্বিশেষে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি আবারও ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি তুলেছেন। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কড়াকড়ি শুরু হলে সেখানেও হামলার হুঁশিয়ারি দেন। এমনকি প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো ও কলম্বিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও ইঙ্গিতে তুলে ধরেন তিনি। যদিও পরবর্তী সময়ে ওই দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে আলোচনার পর তাঁর অবস্থান কিছুটা নরম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ট্রাম্পের সমর্থকদের ভাষ্য, কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কূটনীতির পথে হাঁটেন না।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে ট্রাম্প বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রচলিত ধারা থেকে সরে এসে ‘একলা চলো’ কৌশল গ্রহণ করেছেন। এর অংশ হিসেবে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ অন্তত এক ডজন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এসব সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন কেবল বিশ্বায়নবাদীদের স্বার্থ রক্ষা করছে।
দেশের বাইরের মতো ভেতরেও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মিনিয়াপোলিসে চালানো অভিবাসনবিরোধী অভিযানে এক অভিবাসন কর্মকর্তা রেনি গুড (৩৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহানুভূতি দেখানোর বদলে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ট্রাম্পের বড় পার্থক্য হলো—তিনি গণতন্ত্র বা আদর্শ রক্ষার ন্যূনতম ভানটুকুও করেন না। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ও তাঁর অভিবাসননীতির প্রধান রূপকার স্টিফেন মিলার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাস্তব বিশ্ব চলে শক্তি ও ক্ষমতার ভিত্তিতে; আন্তর্জাতিক সৌজন্যের সময় শেষ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেয়ে দেশটির তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ ও ‘সাম্রাজ্যবাদের’ নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র নিজের তৈরি আন্তর্জাতিক নিয়মই নিজে ভেঙে ফেলছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক মেলানি সিসন মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী যে বিশ্বব্যবস্থা এতদিন পরিচিত ছিল, তা আর ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ট্রাম্পের আনা পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং অন্য শক্তিগুলোও এখন কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী হবে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্রদেশের কূটনীতিকের মতে, বিশ্বব্যবস্থা আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল; ট্রাম্প কেবল সেই বাস্তবতাটিই স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিচ্ছেন।



