

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
‘আমার শিশুসন্তানরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের চিকিৎসা করা দরকার। ঠিকমতো খাবার খাওয়াতেও পারছি না। তাদের কীভাবে বাঁচাবো? আমরা বাঁচতে চাই।’
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে এভাবেই আকুতি জানালেন সুমি আক্তার। চোখে-মুখে অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তার ছাপ। দুই দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন তিনি ও তাঁর পরিবার।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে অবস্থান করছিলেন সুমি আক্তার, তাঁর স্বামী বেলাল হোসেন, দুই শিশুসন্তানসহ ছয়জন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করলেও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধায় তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে দুই দেশের সীমান্তের মাঝামাঝি শূন্যরেখায় অনিশ্চিত অবস্থায় দিন কাটছে তাদের।
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, রোববার ভোরে গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ ছয়জন এবং ইজলামারী সীমান্ত দিয়ে আরও তিনজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধার মুখে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি।
সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, শূন্যরেখার এক পাশে বিএসএফ ও অন্য পাশে বিজিবি অবস্থান করছে। মাঝখানে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে বসে আছেন সুমি ও বেলাল। সুমির কোলে ছয় মাস বয়সী ফাইমা এবং বেলালের কোলে চার বছরের ফাতেমা। রোদ-বৃষ্টি আর গরম সহ্য করে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন তারা।
সুমি আক্তার ও বেলাল হোসেন দাবি করেন, তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামে। কয়েক মাস আগে তাঁরা সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে যান। পরে বিএসএফ তাদের আটক করে রোববার ভোরে সীমান্তে নিয়ে আসে। কিন্তু বিজিবির বাধার কারণে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি।
সাংবাদিকদের দেখে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুমি বলেন, ‘আমাদের বাঁচান। কোন দেশে নেবেন নেন, কিন্তু এভাবে ফেলে রাখবেন না। বাচ্চাগুলো মরে যাবে। আমরা বাঁচতে চাই।’
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বিএসএফ রৌমারীর দুটি সীমান্তপথ দিয়ে নয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা বর্তমানে শূন্যরেখার কাছে ভারতীয় অংশে অবস্থান করছেন। তবে বিএসএফ তাদের ফেরত নেয়নি। একই সঙ্গে বিজিবিও তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি।
এ ঘটনায় রোববার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ দাবি করে, সীমান্তে অবস্থানরত ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক। অন্যদিকে বিজিবি পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়।
গয়টাপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা আগের অবস্থানেই আছেন। তারা শূন্যরেখার কাছে ভারতের অংশে অবস্থান করছেন। গতকাল পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএসএফ তাদের কম্বল, পলিথিন ও খাবার দিয়েছে। স্থানীয় লোকজনও খাবার ও ছাতার ব্যবস্থা করেছেন।’
শিশুদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমনিতে তারা ভালো আছে। তবে প্রচণ্ড গরমে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে।’
জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তে নজরদারি ও জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। সীমান্তে অবস্থানরত নারী-শিশুসহ অন্যরা আগের স্থানেই রয়েছেন। ভারত তাদের ঠেলে দিয়েছে, আমরা প্রবেশ করতে দিইনি। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আপাতত তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’
এদিকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অবস্থানের মাঝখানে মানবিক সংকটে পড়েছে পরিবারগুলো। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক সমাধান না এলে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা



