রাজনীতি

মাইনাস টু থেকে মাইনাস ফোর—বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন শঙ্কা

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। আওয়ামী লীগ আমলসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার সব মামলায় তিনি ও তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান আইনি প্রক্রিয়ায় অব্যাহতি পেয়েছেন। নিরাপত্তার জন্য দুটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনা এবং অস্ত্রের লাইসেন্স আবেদনের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় আইনি বা নিরাপত্তাজনিত বাধা নেই বলেই মনে করা হচ্ছিল। তবু বাস্তবে তার দেশে ফেরা ঝুলে আছে।

বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে প্রভাবশালী কিছু দেশের আপত্তি থাকতে পারে। তবে কোন দেশ, কীভাবে এবং কেন আপত্তি জানিয়েছে—এ বিষয়ে তারা নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকেই বোঝা যায় দেশে ফেরা তার একার সিদ্ধান্ত নয়; বিষয়টির সঙ্গে এমন কিছু শক্তি যুক্ত আছে যা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, উইকিলিকস ফাঁসে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়টি আগেই প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি বলেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন না হলে তারেক রহমান কোন ভরসায় দেশে ফিরবেন? বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা অনেকটাই এ দুই দেশের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল।” তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, ১/১১–এর সময় তারেক রহমানের দেওয়া মুচলেকা, খালেদা জিয়ার সেই মন্তব্য যে তিনি আর রাজনীতি করবেন না—এই অঙ্গীকারগুলোর স্থায়িত্ব আজও পরিষ্কার নয়।

এদিকে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় অভিযোগ করেন, দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পাল্টাতে অগণতান্ত্রিক তৎপরতা চলছে। তার এই মন্তব্য এবং তারেক রহমানের ফেসবুক পোস্ট একসঙ্গে আলোচনায় এনেছে পুরনো ‘মাইনাস টু’ তত্ত্বকে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাকেই ‘মাইনাস টু’ বলা হতো। তবে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাস্তবে এজেন্ডা ছিল ‘মাইনাস ফোর’—দুই রাজনৈতিক পরিবারের ধারাবাহিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পনা। তার ভাষায়, “একটি পরিবারের (শেখ হাসিনা পক্ষ) ‘মাইনাস’ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। খালেদা জিয়া অসুস্থতার কারণে নিষ্ক্রিয়। ফলে বাকি থাকলেন তারেক রহমান। তার দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত ঘটনাকে মাইনাস ফোর–এ নিয়ে যায় কি না তা সময়ই বলবে।”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা এখন সামনে আসছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পার্শ্ববর্তী দুই দেশের রাজনৈতিক পরিবারকে টার্গেট করে বড় ধরনের হামলা—ভারতে রাজীব গান্ধী হত্যা এবং পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো হত্যার পর দেশ দুটির পরিবারভিত্তিক রাজনীতি দীর্ঘদিন পিছিয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশেও এমন ঘটনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যেই ক্ষমতা হারিয়ে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে গেছে; ফলে যদি তারেক রহমানের জীবনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, বিএনপিও অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যেতে পারে।

খালেদা জিয়ার অত্যন্ত নাজুক শারীরিক অবস্থাও তারেক রহমানের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। বিএনপি নেতা-কর্মীদের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আর ফিরতে না পারলে এবং তারেক রহমান দেশে ফিরতে না পারলে দলটি নেতৃত্বশূন্যতায় মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।

তবে বিএনপির কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, দেশে ফিরবেন তারেক রহমান এবং তিনিই নির্বাচন পরিচালনায় দলের নেতৃত্ব দেবেন। সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত না হলেও বিএনপির ভেতরে শেষ আশার জায়গাটি এটাই।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button