

বিয়ের পিঁড়িতে হাসিমুখে বসেছিলেন বর। কিন্তু বাসর ঘরে ঢুকে যেন সবকিছুই ওলটপালট হয়ে যায়। অভিযোগ ওঠে, যাকে দেখে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন, ঘোমটা খুলতেই দেখা যায় তিনি অন্য একজন। কনে বদলের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ ও রাণীশংকৈল এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডার এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত, আর শেষ পর্যন্ত একজনকে যেতে হয় কারাগারে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১ আগস্ট রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডার এলাকার বাসিন্দা জিয়ারুল হকের মেজো মেয়ের সঙ্গে পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের বিয়ে হয়। তবে বিয়ের রাতেই বর ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কনে বদলের অভিযোগ তোলা হয়।
ঘটনাটি মীমাংসার জন্য দুই পক্ষ একাধিকবার আলোচনায় বসলেও কোনো সমাধান হয়নি। পরে গত বছরের ২৭ আগস্ট কনের বাবা জিয়ারুল হক বর রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানকে আসামি করে ঠাকুরগাঁও আদালতে একটি মামলা করেন। এর জবাবে ২ সেপ্টেম্বর রায়হান কবির কনের বাবা ও ঘটক মোতালেবকে আসামি করে পাল্টা মামলা দায়ের করেন।
উভয় পক্ষের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আদালত রায়হান কবিরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রায়হান কবিরের মামা বাদল অভিযোগ করে জানান, ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে রায়হানের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে রাণীশংকৈলের শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে ঘটক একটি মেয়েকে দেখান। মেয়েটিকে পাত্র ও স্বজনদের পছন্দ হলে বিষয়টি ঘটককে জানানো হয়। পরে মেয়েপক্ষ ছেলেপক্ষের বাড়িতে এসে আত্মীয়তার প্রস্তাব দেয় এবং নতুন করে মেয়ে না দেখিয়েই দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করার অনুরোধ জানায়।
তিনি আরও বলেন, রায়হানের দুলাভাই মানিক হাসান মালয়েশিয়া প্রবাসী হওয়ায় দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করার তাগিদ ছিল। ১ আগস্ট রাত ১১টার দিকে দুটি মাইক্রোবাসে বরযাত্রী নিয়ে মেয়ের বাড়িতে যাওয়া হয়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভোরের দিকে সবাই বাড়ি ফেরে।
বাদলের অভিযোগ, অতিরিক্ত মেকআপের কারণে বিয়ের রাতে কনে বদলের বিষয়টি বোঝা যায়নি। তবে বাসর রাতে কনে মুখ ধোয়ার পর রায়হান বুঝতে পারেন, তিনি যাকে বিয়ে করেছেন তিনি সেই আগে দেখানো মেয়ে নন। পরদিন ২ আগস্ট মেয়েটিকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রতারণার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। তার দাবি, ঘটক ও কনের বাবা পরিকল্পিতভাবে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কনের বাবা জিয়ারুল হক বলেন, তার কোনো ছেলে সন্তান নেই এবং তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে আগেই। মেজো মেয়েকেই ছেলেপক্ষ বাড়িতে এসে দেখে গিয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন বরযাত্রী উপস্থিত ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে কনে বদলের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।
জিয়ারুল হকের অভিযোগ, এটি একটি সাজানো নাটক। বিয়ের পর ছেলেপক্ষ ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। তিনি জমি বিক্রি করে টাকা দেওয়ার জন্য সময় চাইলে তারা তা না মেনে তার মেয়ের বিরুদ্ধে অপবাদ দিচ্ছে বলে দাবি করেন।
ঘটক মোতালেবও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো ভুল মেয়ে দেখাননি। বাড়িতেই মেয়ে দেখানো হয়েছিল এবং পরে উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েই বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করেছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও ছেলেপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বলেন, ছেলেপক্ষের অভিযোগ হলো মেয়েপক্ষ ও ঘটক মিলে কনে বদলের মাধ্যমে প্রতারণা করেছে। শুরুতে মীমাংসার আশায় রায়হান কবির জামিনে ছিলেন। তবে সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি এখন পুরোপুরি বিচারাধীন। আদালতের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।



