জাতীয়

আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয় : রামিসার বাবা

অনলাইন নিউজ ডেস্ক

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা। এ সময় ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আজ মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে সাক্ষ্য দিতে এসে তিনি মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করে বলেন, ‘আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’
আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমি আদালতের কাছে আমার নিষ্পাপ সন্তানের ওপর সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও বর্বরোচিত ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। একইসঙ্গে এই বিচারের দ্রুত কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। আমি চাই না, আর কোনো বাবা-মায়ের বুক এভাবে খালি হোক, কোনো পরিবার সন্তান হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়ুক কিংবা বিচার চেয়ে আদালতের বারান্দায় দাঁড়াতে বাধ্য হোক।
সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে এই সন্তানহারা বাবা বলেন, ‘এমন একটি আইন প্রণয়ন করা হোক যাতে কোনো আসামি স্বীকারোক্তি দিলে এক মাসের মধ্যেই মামলার রায় দেওয়া এবং তা কার্যকর করার ব্যবস্থা থাকে। দেশের মানুষও দ্রুত ও কার্যকর বিচার প্রত্যাশা করে। আমিও সেই প্রত্যাশাই করছি।’
এদিন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আব্দুল হান্নান মোল্লা। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় কিছু ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে পরে তাকে বসার জন্য একটি চেয়ার দেওয়া হয়।
আব্দুল হান্নান জানান, ঘটনার দিন সকালে তিনি অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। তার অফিস কাকলি এলাকায় হওয়ায় ক্যান্টনমেন্ট হয়ে সেখানে যাচ্ছিলেন। সকাল আনুমানিক ১০টা থেকে সোয়া ১০টার মধ্যে তার স্ত্রী পারভীন আক্তার ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে তাকে বাসায় ফিরতে বলেন।
আদালতকে তিনি বলেন, ‌‘ফোন পাওয়ার পর বাসায় ফিরতে আমার ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। এসে দেখি আমাদের ফ্ল্যাটের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। দ্রুত ওপরে উঠে যাই। তখন আমার স্ত্রী অনেকক্ষণ ধরে পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় ডাকাডাকি করছিল, কিন্তু কেউ দরজা খুলছিল না।’
হান্নান মোল্লা জানান, পরে তিনি নিজেও দরজা খোলার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে হাতুড়ি দিয়ে দরজার লক ভেঙে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। তার কথায়, ‘ভেতরে ঢুকে টয়লেটের সামনে সামান্য রক্ত দেখতে পাই।’
সাক্ষ্যগ্রহণকালে আব্দুল হান্নান আদালতকে আরও জানান, ঘটনার আগে তিনি আসামিদের চিনতেন না। ‘আমি আসামিকে জীবনেও দেখিনি’, বলেন তিনি।
সাক্ষ্য শেষে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। পরে আদালত পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় মোট ১৭ জন সাক্ষী রয়েছেন। রামিসার বাবার পাশাপাশি আদালতে মামলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেবেন। এসব সাক্ষীর মধ্যে রয়েছেন সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রতিবেশীরা। সাক্ষ্যগ্রহণের ধারাবাহিকতায় পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সাক্ষীদের জবানবন্দিও গ্রহণ করা হবে।
আজ সকাল পৌনে ৯টার দিকে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় তাদের এজলাসে তোলা হবে।
এর আগে, সোমবার (১ জুন) মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন একই আদালত। মামলায় সাক্ষ্য দিতে ১৭ সাক্ষীকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করা হয়।
গতকাল (সোমবার) আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের উদ্দেশে চিৎকার করে সোহেল রানা বলেন, ‘ধর্ষণ করছে, মারছে ডলার, ওরে ধরেন। ডলার দুই লাখ টাকা দিচ্ছে।’
নতুন নাম আসা এই ডলারের পরিচয় জানতে চাওয়া হলে সোহেল রানা জানান, ‘সে মিরপুর ১১ নম্বর রোডের এক বাড়ির অনেক টাকাওয়ালা লোক।’ এ সময় নিজের ডিএনএ টেস্ট না করিয়েই ‘অটোমেটিক’ সব লেখা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন এই আসামি।
গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন।
পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামি করে সেদিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে গত ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান দুইজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্রটি দেখে বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় বদলির আদেশ দেন। মামলাটি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ওইদিনই বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।
শুরুতে সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিলেও তিনি ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে চার্জগঠন শুনানি শুরুর পর গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের কাছে নতুন দাবি করেন তিনি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button