খেলাধুলা

জার্সি বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করানো গোলকিপারই জার্মান বধের নায়ক

অনলাইন নিউজ ডেস্ক

বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে প্যারাগুয়ে। দলের এই স্মরণীয় জয়ের নায়ক গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। টাইব্রেকারে দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে ২৬ বছর বয়সী ও ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষক নিশ্চিত করেন প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয়। তার বীরত্বে বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো নকআউট পর্বের বাধা পেরোয় দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। অথচ মাত্র চার বছর আগেও চরম আর্থিক সংকটে পড়ে নিজের খেলার সরঞ্জাম বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়েছিল তাকে।

চলতি বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে খেলছেন গিল। টুর্নামেন্টের শুরুতে যৌথ আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪–১ গোলে হেরে অভিযান শুরু করলেও পরের ম্যাচগুলোতে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়সহ শেষ তিন ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেন এই গোলরক্ষক। এ সময়ে প্রতিপক্ষের অন-টার্গেট ১৭টি শটের মধ্যে ১৬টিই অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন তিনি। সর্বশেষ জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে জয়ের পাশাপাশি ম্যাচসেরার পুরস্কারও জিতে নেন।

ম্যাচ শেষে নিজের এই ঐতিহাসিক অর্জন পরিবার এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভাগনে আলেকজান্ডারকে উৎসর্গ করেন গিল। আবেগঘন বার্তায় তিনি বলেন, “আলেকজান্ডার, এই ট্রফিটা তোমার জন্য। আশা করি তুমি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। দূর থেকে তোমার গডফাদার সবসময় তোমার পাশে আছে।”

আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠিন সংগ্রামের গল্প। ২০২২ সালের শেষ দিকে নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম নেয় তার ছেলে লাউতারো। শারীরিক জটিলতার কারণে ওই বছরের ডিসেম্বরে গিলের স্ত্রীর জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয় এবং নবজাতককে দীর্ঘ সময় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখতে হয়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও পরিবারটি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে। পরে গিলের স্ত্রী মেলিসা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, পরিবারের ব্যয় এবং সন্তানের চিকিৎসার খরচ চালাতে গিল নিজের খেলার সরঞ্জাম, পোশাক, বুট, এমনকি অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের জার্সিটিও বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

প্যারাগুয়ের ক্লাব ১৩ দে জুনিও ও সিএস সান লোরেঞ্জোর যুব দলে ফুটবলের হাতেখড়ি হয় গিলের। ২০১৯ সালে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে ডাক পেলেও ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সিনিয়র পর্যায়ে ক্লাব ফুটবলে তার ম্যাচসংখ্যা ছিল মাত্র তিনটি। কঠিন সেই সময়ে আর্জেন্টিনার শীর্ষ স্তরের ক্লাব সান লোরেঞ্জো তাকে ধারে দলে নেয়। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত রিজার্ভ দলে খেলার পর ২০২৫ সালে মূল একাদশে নিয়মিত সুযোগ পান তিনি।

ক্লাব পর্যায়ে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স দ্রুতই জাতীয় দলের কোচ গুস্তাভো আলফারোর নজর কাড়ে। গত সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে পেরুর বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর আরও পাঁচটি প্রীতি ম্যাচে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন গিল। অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় দলের এক নম্বর গোলরক্ষকের জায়গা নিশ্চিত করেন তিনি। সেই আস্থারই চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা গেল বিশ্বকাপের মঞ্চে, যেখানে জার্মানির বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে প্যারাগুয়েকে এনে দিলেন এক রূপকথার জয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button