

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে ভিন্ন ভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত। শুক্রবার দেওয়া রায়ে আদালত বলেছে, একতরফাভাবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক বসিয়ে প্রেসিডেন্ট Donald Trump ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছেন।
আদালতের মতে, এমন পদক্ষেপ পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প নতুন করে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি জানান, ওভাল অফিসে বসেই আদেশে স্বাক্ষর করা হয়েছে এবং এটি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। নতুন শুল্ক মঙ্গলবার থেকে চালু হবে।
আদালতের সিদ্ধান্তের পর ওয়াল স্ট্রিটে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও একই দিন ট্রাম্প ‘ধারা ১২২’ নামে পরিচিত প্রায় অব্যবহৃত একটি আইনের আওতায় নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন।
এই আইনে প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য আরোপ করতে পারেন। এর মধ্যে কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়। নতুন আদেশে কিছু খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ, সার, কমলা ও গরুর মাংসসহ কৃষিপণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস এবং নির্দিষ্ট কিছু গাড়িকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে ছাড়ের তালিকা অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
USMCA চুক্তির আওতায় কানাডা ও মেক্সিকোর বেশিরভাগ পণ্য ছাড় পাবে। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, তাদের অনেকের ওপরও নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে মামলা করা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য আদালতের রায়কে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইইইপিএ-এর আওতায় আদায় করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার শুল্ক ফেরতের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
তবে এতে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, আদালতের রায় মানেই শুল্কের অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত যাবে না; বিষয়টি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে এবং এতে কয়েক বছরও লাগতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুল্ক কার্যকরের জন্য তার হাতে আরও আইনি পথ রয়েছে এবং এসব শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে।
প্রধান বিচারপতি John Robertsসহ ছয় বিচারক ট্রাম্পের শুল্কের বিপক্ষে মত দেন। তাদের মধ্যে তিনজন উদারপন্থি বিচারকের পাশাপাশি ট্রাম্পের মনোনীত দুই বিচারকও ছিলেন। তবে তিন রক্ষণশীল বিচারক সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের বিরোধিতা করেন।
রায়ের পর ট্রাম্প বলেন, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিচারকেরাই তার নীতির বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় তিনি ‘ভীষণ লজ্জিত’। তার ভাষায়, ওই বিচারকেরা ‘বোকা ও তোষামোদকারী’ এবং তাদের মধ্যে ‘দেশপ্রেমের অভাব’ রয়েছে।
রায়ে রবার্টস উল্লেখ করেন, সংবিধান অনুযায়ী কর ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে, প্রেসিডেন্টের নয়। শুল্ক আরোপের মতো অস্বাভাবিক ক্ষমতা প্রয়োগে কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন—যা ট্রাম্প দেখাতে পারেননি।
আদালত আরও জানায়, আইইইপিএ-তে ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘আমদানি’ শব্দ থাকলেও এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন সময়ের জন্য যেকোনো দেশের ওপর যেকোনো হারে শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
মামলায় প্রতিবাদকারী অঙ্গরাজ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, যে আইনের আওতায় শুল্ক আরোপ করা হয়েছে সেখানে ‘ট্যারিফ’ শব্দটিরই উল্লেখ নেই। রবার্টস তার মতামতে এই যুক্তির প্রতি সমর্থন জানান।
ট্রাম্প দাবি করেন, এই রায়ে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো উচ্ছ্বসিত হয়েছে, যারা বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকিয়ে এসেছে। তবে তারা বেশিদিন আনন্দ করতে পারবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
রায়ের পর ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা যায়। S&P 500 প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়ে দিন শেষ করে। তবে শুল্ক ফেরত ও ব্যয়মুক্তির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ নেবে কি না—তা এখনও অনিশ্চিত।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স



