সাহিত্য-সংস্কৃতি

পিঠেপুলি খাওয়া ও বেড়া ঘর’ পোড়ানো পৌষ সংক্রান্তি মানুষ মানুষের মধ্যে আনন্দ বাঙালি ঐতিহ্য।

আশীষ দাশ গুপ্ত লাখাই প্রতিনিধি ॥

বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ উৎসব পৌষ সংক্রান্তি। বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিনে পালন করা হয় এই উৎসবটি। উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ হল শীতের মজার সব পিঠা। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময়েই

‘বেড়া ঘর’ পোড়ানো হবিনাম নিয়ে এক বাড়ী থেকে অন্য যাওয়া মানুষ মানুষের মধ্যে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া।

আনুষ্ঠানিক ভাবে খোলা পুড়িয়ে (চিতই পিঠা বানানোর মাটির পাত্র) পিঠা তৈরি শুরু করা হয়। অনেকেই এই দিনের আগে পিঠা খান না। আর তাই এই সংক্রান্তি পিঠা উৎসবে পরিণত হয়েছে। পৌষ সংক্রান্তিকে মকর সংক্রান্তিও বলা হয়ে থাকে। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিনে এই উৎসব হয়ে থাকে। শেষের দিন হলেও সাধারণত দুই-তিন দিন ধরে হরেক রকম পিঠা বানানোর কাজ চলে প্রতিটি হিন্দু বাড়িতেই। চলে জামাইকে নিমন্ত্রণ অথবা জামাইয়ের বাড়িতে তৈরি পিঠা পৌঁছে দেওয়ার পালা। একসময় গ্রাম-বাংলায় বেশ ঘটা করে এই দিন পালনের রেওয়াজ ছিল। তবে কালের বিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে গেছে সেসব রীতিনীতি। এই বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করে একসময় এ দেশে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসবের আয়োজন করা হতো। তাছাড়া বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই বাজি ফোটানো, ফানুস ওড়ানো এসব আনন্দ উৎসবের ভেতর দিয়ে আনন্দমুখর এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটত। পিঠা যে শুধু খাওয়া নয়, বরং সবাই মিলে আনন্দ করার এক অনুষঙ্গ সেটাও টের পাওয়া যায় এই উৎসব থেকে। ে

মহাভারতের যুদ্ধের পর অর্জুনের বাণে শরশয্যায় শায়িত হয়ে তিনি নিজের ইচ্ছায় পৌষ সংক্রান্তির শুভ দিনে দেহত্যাগ করেন, তাই এটি ভীষ্মের মহাপ্রয়াণের দিন হিসেবেও পালিত হয়।

মকর সংক্রান্তি তিথির প্রচলিত ও জনপ্রিয় আরও একটি পার্বণ বা বেড়াবেড়ির ঘর তৈরি। মূলত কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েরা এ ঘর তৈরি করে। গ্রামীণ জনপদে ঐতিহ্যবাহী চিরাচরিত এ সংস্কৃতি এখনো রয়ে গেছে। অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে জমি থেকে ধান কেটে নিলে যে খড় মাঠে পড়ে থাকে কিশোর-কিশোরীরা সেই খড় কেটে আনে। গ্রাম-বাংলার অনেক অঞ্চলে এগুলিকে নাড়া বলে। এই নাড়া ও বাঁশ দিয়ে বাড়ির পাশে ফাঁকা জমিতে তৈরি করা হয় ঘর। ছেলেরা দলবেঁধে এ কাজ করে। অনেক সময় তাদের সহযোগিতায় কাজে হাত লাগান বড়রাও। এই বাঁশ ও নাড়ার ঘরেও ফুটিয়ে তোলা হয় নান্দনিকতা। কেউ এই ঘর তৈরি করেন অতি সাধারণভাবে দোচালা, কেউ চার চালা আবার কেউ তৈরি করেন দোতলা ঘর। কখনো-সখনো ১০ দিন ধরে কাজ করে তৈরি করা হয় এসব ঘর। তারপর মকর সংক্রান্তির আগের দিন রাতে এই ঘরের ভেতর সবাই মিলে মাছ, মাংস, ডিম সাধ্যমতো রান্না করে হয় জমজমাট পিকনিক। অনেকে রাতে ঘুমিয়েও কাটায় এই ঘরে। পরদিন অর্থাৎ, মকর সংক্রান্তির দিন ভোরে সূর্যোদয়ের আগে স্নান সেরে ওই ঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে সেই আগুনের উত্তাপে নিজের শরীর উত্তপ্ত করা হয়। সবশেষে বাড়ি ফিরে মা, ঠাকুরমার হাতে তৈরি পিঠে-পুলি খেয়ে শুরু হয় মকর সংক্রান্তির মূল আনন্দ উপভোগ। রোববার (১৪ জানুয়ারি) পৌষ সংক্রান্তির এই দিনটিকে উৎসবের আমেজে পালন করবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button