

মহান আল্লাহ তাআলা আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর উম্মতের জন্য ইবাদতের বিশেষ কিছু সময় নির্ধারণ করেছেন, যেগুলোতে আমলের ফজিলত বেশি। এর মধ্যে পাঁচটি রাত বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ—জুমার রাত, দুই ঈদের রাত, শবেবরাত (মধ্য শাবানের রাত) এবং শবেকদর। এসব রাতে ইবাদত-বন্দেগি করলে অতিরিক্ত সওয়াব ও বরকত লাভ করা যায়। যদিও আল্লাহর ইবাদত যে কোনো সময় করা যায়, তবু সময়ভেদে এর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। শবেবরাত, অর্থাৎ ১৪ শাবানের দিবাগত রাত, তেমনই এক বরকতময় সময়।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন—এই রাতে আল্লাহ তাআলা বনি কালব গোত্রের ভেড়া-বকরির পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক গুনাহগারকে ক্ষমা করেন (তিরমিজি: ৭৩৯)।
শবেবরাত হলো ইবাদত, দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার এক অনন্য সুযোগ। হজরত আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন—শাবানের মধ্যরাতে তোমরা নফল নামাজ আদায় করো এবং পরদিন রোজা রাখো। এ রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন এবং ক্ষমা, রিজিক ও মুক্তি প্রার্থনাকারীদের ডাকে সাড়া দেন—এ আহ্বান ফজর পর্যন্ত চলতে থাকে (ইবনে মাজা: ১৩৮৮)।
এ রাতের গুরুত্বের কারণে মহানবী (সা.) নিজেও গভীরভাবে ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার তিনি দেখেন নবীজি (সা.) দীর্ঘ সেজদায় রত। পরে তিনি জানান, এটি মধ্য শাবানের রাত—এ রাতে আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন এবং বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থায় ছেড়ে দেন (শুয়াবুল ইমান)।
তাবেয়িদের মধ্যেও এ রাতের বিশেষ কদর ছিল। খালিদ বিন মাদান, মকহুল ও লোকমান বিন আমের (রহ.) প্রমুখ এ রাতে বাড়তি ইবাদতে মশগুল থাকতেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) উল্লেখ করেছেন—বছরের পাঁচটি রাতে দোয়া কবুলের বিশেষ আশা করা যায়: জুমার রাত, দুই ঈদের রাত, অর্ধশাবানের রাত এবং রজব মাসের প্রথম রাত (কিতাবুল উম্ম)।
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, মক্কার অধিবাসীরাও শবেবরাতে মসজিদুল হারামে সমবেত হয়ে নামাজ, তওয়াফ ও কোরআন তিলাওয়াতে রাত কাটাতেন। তারা জমজমের পানি পান করতেন ও বরকতের আশায় সংরক্ষণ করতেন (আখবারে মক্কা)।
এই বরকতময় রাতে যেসব আমল করা যেতে পারে—নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত, তওবা-ইস্তেগফার, দরুদ শরিফ, জিকির-আজকার, দোয়া, দান-সদকা ও পরদিন রোজা রাখা। তবে অনেকেই এ রাতে অতিরিক্ত খাবার আয়োজন ও ব্যস্ততায় ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যান—যা কাম্য নয়।
এ রাতে অপচয়, অনর্থক আনন্দ-উল্লাস, আতশবাজি, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা, শরিয়তবিরোধী কাজ বা অন্যের ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এ বরকতময় রাতের যথাযথ মর্যাদা বুঝে আমল করার তাওফিক দান করুন।
—লেখক: ইমাম ও খতিব



