মতামত

তেলা মাথায় আর কত তেল দেবেন?

বেশিদিন আগের ঘটনা নয়—গত বছরের অক্টোবরে বেতনভাতা বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে নামেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকা করা এবং উৎসব ভাতা ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ।

১২ অক্টোবর আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৭ অক্টোবর কর্মসূচিতে যুক্ত হয় সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি। তবে সরকার প্রথমে পুলিশি দমন, পরে সীমিত বেতন বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন স্তিমিত করে। প্রায় চার লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দাবিও সরকার গ্রহণ করেনি।

৮ নভেম্বর দশম গ্রেডসহ তিন দফা দাবিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। আন্দোলন চলাকালে তাঁরা পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেডের মুখে পড়েন। তাঁদের দাবি ছিল ১৩তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণ, নির্দিষ্ট সময় পর উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা দূর করা এবং প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি।

ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকরাও বেতন বৃদ্ধি ও শিক্ষাকার্যক্রম জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। ২৯ অক্টোবর সচিবালয় অভিমুখে মিছিল নিয়ে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এবং সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল ও জলকামানে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এতে বহু শিক্ষক আহত হন।

শিক্ষকদের মতো শ্রমিকরাও মুদ্রাস্ফীতির চাপে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাকশ্রমিকরা বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষে জড়ান। এসব ঘটনায় একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে এবং একজন অগ্নিকাণ্ডে মারা যান বলে জানা যায়। তবুও শ্রমিকদের দাবিও পূরণ হয়নি।

অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো অবস্থানে আছেন। বিগত সরকারের আমলে আমলাদের বেতন ও সুবিধা অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে, নিয়মিত ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি বিশেষ সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। এখন আবার তাঁদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এই পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, যা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে করের বোঝা বাড়বে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন সরকার বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিগত সরকারের আমলে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা ও দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বেড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক আমলা বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন, অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও ধীরে ধীরে আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

লেখকের মতে, যারা প্রকৃতপক্ষে বেতন বৃদ্ধির যোগ্য—শিক্ষক ও শ্রমিক—তাঁদের পুলিশি দমন করা হয়, আর আমলাদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button