সারাদেশ

ক্ষেপণাস্ত্র না থাকলে ইরান হতো আরেক গাজা

তুমি যদি নেকড়ে না হও, নেকড়েরা তোমাকে খেয়ে ফেলবে।’ জন্মসূত্রে পাওয়া মরুর বেদুইন সমাজের এই পৈতৃক সম্পদের তেজেই আজ বিশ্ব মানচিত্রে ‘নয়া খেলোয়াড়’-এর পালক বসেছে ইরানের মুকুটে। টিকে থাকার লড়াইয়ের ব্রহ্মাস্ত্র যাকে বলে। গত মঙ্গলবার এক দিনের পাকিস্তান সফরে বিশ্বকে নতুন করে সে কথাটিই মনে করিয়ে দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বললেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র না থাকলে গাজার দশা হতো ইরানের। ধ্বংসস্তূপে পরিণত করত ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র।’ ইরানের এ কঠোর অবস্থানই ঢাল-তলোয়ার ফেলে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বাধ্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রকে।

এরই নাম শক্তের ভক্ত, নরমের যম। মধ্যপ্রাচ্যের দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বের দুই ভূখণ্ডেই তার নমুনা দেখল বিশ্ব। একটি ফিলিস্তিনের ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের অবরুদ্ধ উপত্যকা গাজা। দ্বিতীয়টি ইরান। আয়তনে ১৬,৪৮,১৯৫ বর্গকিলোমিটার। গাজার চেয়ে ৪৫১৫ গুণ বড়। মধ্যপ্রাচ্যের ‘সন্ত্রাসীরাষ্ট্র’ ইসরায়েল একাই লন্ডভন্ড করে দিয়েছে বছরের পর বছর ধরে সাত সীমান্ত সিল করে রাখা গাজাকে।

দুই বছর আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামলায় হত্যা করেছে ৭৩ হাজারের বেশি নিরস্ত্র নাগরিককে। ইরানের বেলায় ঠিক এর উল্টোটা।  ইসরায়েল একা দূরের কথা; মনিবরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারেনি। তিন বছর দূর কি বাত; তিন মাসেই পায়ে পড়তে হয়েছে ইরানের। দুই হাজার বছর আগের সেই রোমান সম্রাটের মতো। প্রথমবার তো মাত্র ১২ দিনেই ‘হাতজোড়’ করে ইসরায়েল।

যুদ্ধবিরতি আলোচনার পরবর্তী ধাপের সলাপরামর্শেই এদিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে বসেন পেজেশকিয়ান। পরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে এদিন নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন তিনি। বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা না থাকলে দেশটিকে গাজার মতো ধ্বংস করে দিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। বৃদ্ধ কিংবা শিশু— কাউকেই রেহাই দিত না। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে জানিয়েছেন, জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে তেহরান কোনো অবস্থাতেই কারও সঙ্গে আলোচনায় বসবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের সময় আকাশ প্রতিরক্ষার সীমাবদ্ধতা থেকেই প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তোলে ইরান। পরবর্তী কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা। গত সোমবার সুইজারল্যান্ডের আলোচনা থেকে ফেরার পর গতকাল বুধবার আজারবাইজান সফরে গিয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে তুলোধুনো করেন ইরানের আরেক নেতা জাতীয় সংসদের স্পিকার  ও যুদ্ধবিরতি আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।  রাজধানী বাকুর ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সংসদীয় ইউনিয়নের সম্মেলনে বলেছেন— যুদ্ধ অবসানের যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা আসলে ‌‌‘যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের ঘোষণা’। ইসলামাবাদ সমঝোতা কোনো চাপ বা জবরদস্তির ফল ছিল না; বরং এটি সাহসী ইরানি জাতির প্রতিরোধ ও কর্তৃত্বের ফল। আর এ কারণেই ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের ঘোষণায় পরিণত হয়েছে। এদিনই অবশ্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র  শান্তিচুক্তি আলোচনার  পরবর্তী ধাপের সময়সূচি ঘোষণা করে পাকিস্তান। আগামী সপ্তাহেই আবার শুরু হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা। ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা জানালেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দারাবি। তিনি বলেছেন, ‘সোমবার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার একটি বৈঠক হয়। সেই ফলপ্রসূ আলোচনার সূত্র ধরে আগামী সপ্তাহের শুরুতে কারিগরি পর্যায়ের এই আলোচনা আবার শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

সংশয় ভাঙতে মিত্রদেশে রুবিও: শান্তিচুক্তি ইরানকে কতটা সুবিধা পাইয়ে দেবে, তা নিয়ে সন্দিহান যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা। হরমুজ থেকে ইরান টোল আদায়ের সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশায় রয়েছে তারা। ৩০ হাজার কোটি ডলারের প্রস্তাবিত তহবিলও তেহরানের প্রতি ‘বাড়তি উদারতা’ বলে মনে করছে তারা। এ অবস্থায় বন্ধুদের আশ্বস্ত করতে পশ্চিম এশিয়ায় সফর শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে তার সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইন সফর।

আবুধাবিতে পৌঁছে মঙ্গলবারই ‘বন্ধুদের’ আশ্বাস দিয়েছেন রুবিও। জানিয়েছেন, অবাধ থাকবে হরমুজে জাহাজ চলাচল। ওই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজের কাছ থেকে কোনো দেশকেই ‘টোল’ আদায় করতে দেওয়া হবে না। ইরানকেও নয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button