

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
ছেলেকে হারানোর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শোকের ভার এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন শহীদ সিরাজুল ইসলাম ব্যাপারীর বাবা শফিকুল ইসলাম। তবে শুধু সন্তানের শোকই নয়, তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে আরেকটি আক্ষেপ—যে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার আশায় তার ছেলেসহ অনেকে জীবন দিয়েছিলেন, সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন তিনি এখনো দেখতে পাচ্ছেন না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার বাড্ডায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ফরিদপুর সদরের ডিক্রির চর ইউনিয়নের তায়জদ্দিন মুন্সীর ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ব্যাপারী (২৮)। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। বিবাহিত হলেও তার কোনো সন্তান ছিল না। ঢাকার বাড্ডায় একটি রিকশা গ্যারেজের যৌথ মালিক ছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর তাকে ফরিদপুর শহরের ধলার মোড় সংলগ্ন স্থানীয় একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে নিজ বাড়িতে কথা হয় সিরাজুলের বাবা শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমাদের ছেলেরা আন্দোলনে নেমেছিল একটি ভালো দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেই স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন এখনো দেখতে পাচ্ছি না।”
তার ভাষায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ভয় থাকবে না, জোর করে কারও জমি দখল করা হবে না এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হবে। কিন্তু বাস্তবতায় সেই পরিবর্তন তিনি দেখতে পাননি বলেই দাবি করেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা এমন একটি দেশ চেয়েছিলাম, যেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে চলাফেরা করবে, কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম থাকবে না, চাঁদাবাজি হবে না, কেউ কারও জমি জোর করে দখল করবে না। সেই পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।”
তিনি ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিচারও দাবি করেন। তার বক্তব্য, “সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন—আমার ছেলে যে আন্দোলনে প্রাণ দিল, সেই হত্যার বিচার হোক। শুধু আমার ছেলে নয়, আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছেন, সবার মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত।”
এদিকে বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন শফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শিরিন আক্তার। শফিকুল ইসলামের হৃদরোগ রয়েছে। তার স্ত্রীর গলায় জটিলতা দেখা দেওয়ায় বর্তমানে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন।
পরিবারটি সরকারের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পেয়েছে, যার মুনাফা হিসেবে শফিকুল ইসলাম প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা পান। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং বিএনপির পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। সিরাজুলের স্ত্রীও সরকারের দেওয়া ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে মাসে ১০ হাজার টাকা পান। পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছ থেকেও তিনি ৬০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর সিরাজুলের স্ত্রী আর শ্বশুরবাড়িতে ফিরে আসেননি; বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে থাকেন। তবে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে নিয়মিত মুঠোফোনে যোগাযোগ রাখেন।
কথার একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি জানি, কোনো ক্ষতিপূরণেই আমার ছেলেকে আর ফিরে পাব না। সে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু যে আদর্শ ও স্বপ্ন নিয়ে আমাদের সন্তানরা রক্ত দিয়েছে, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন যদি আমরা দেখে যেতে না পারি, তাহলে আমাদের মন কখনো শান্তি পাবে না।”



