

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সংবেদনশীল সময়ে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সোমবার সেনা সদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে—এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে প্রফেসর ইউনূস বলেন, দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত একটি জাতি জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, এই নির্বাচনে ভোটদান হবে তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে মতামত জানাবে এবং সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নে যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবে।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে তরুণদের একটি বড় অংশ প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছে। পাশাপাশি বহু নাগরিক দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এমন বাস্তবতায় সব ভোটারের জন্য ভয়মুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় এই দায়িত্ব পালনে সশস্ত্র বাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচন পরিচালনায় সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মাঠপর্যায়ে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল। সামান্য কোনো বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন কোনো ভয়ভীতি বা প্রভাব ছাড়া নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে হবে।
এ ছাড়া তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা উপেক্ষিত ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও যেকোনো আগ্রাসন মোকাবেলায় বাহিনীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রফেসর ইউনূস জানান, সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নেদারল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ইতালি, জাপান, থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে অনুরূপ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান আছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সেনা সদরের হেলমেট অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস এম কামরুল হাসান প্রধান উপদেষ্টাকে অভ্যর্থনা জানান।
মতবিনিময় সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।



