

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
ম্যাচের শুরুতে লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস যেন আর্জেন্টিনার জন্য অশনি সংকেতই ছিল। তার ওপর মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। একের পর এক দুর্দান্ত সেভে তিনি আর্জেন্টিনাকে গোলবঞ্চিত করেন। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় আর্জেন্টিনার বিদায়ই যেন সময়ের অপেক্ষা ছিল। কিন্তু এরপরই ফুটবল বিশ্ব দেখল অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তন। মাত্র ১৪ মিনিটে তিনটি গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় লিওনেল স্কালোনির দল। ম্যাচ শেষে নায়কোচিত পারফরম্যান্সের জন্য সতীর্থরা মেসিকে কাঁধে তুলে উদযাপন করেন।
৪-৪-২ ফরমেশনে খেলে বলের দখল ছিল আর্জেন্টিনার ৬৪ শতাংশ। পাঁচটি বড় সুযোগ নষ্ট করেও শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে তারা। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো মিশরের মুখোমুখি হয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয় স্কালোনির শিষ্যরা। লাউতারো মার্তিনেজের বদলে হুলিয়ান আলভারেজকে একাদশে নামালেও প্রথমার্ধে মিশরের সংগঠিত রক্ষণভাগে তেমন ফাটল ধরাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ কিছুটা সৃজনশীলতা দেখালেও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারসহ অন্যরা ছিলেন নিষ্প্রভ।
অন্যদিকে একই ফরমেশনে খেলা মিশর প্রথমার্ধে মূলত আত্তিয়া ও আসুরের ওপর নির্ভর করে আক্রমণ সাজায়। প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণ থেকেই তারা এগিয়ে যায়। ১৫তম মিনিটে আত্তিয়ার নেওয়া কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করেন ইয়াসির আহমেদ ইব্রাহিম এল হানাফি। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ব্যর্থ হলে সুযোগটি কাজে লাগিয়ে মিশরকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ইয়াসির।
২০২২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ার পর এই প্রথম বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। এর আগে টানা ১০টি বিশ্বকাপ ম্যাচে তারা কখনোই প্রথমে গোল হজম করেনি।
১৯তম মিনিটে সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ হন মেসি। নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে ডি-বক্সে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু মেসির নেওয়া শট বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন মোস্তফা শোবেইর।
এটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির অষ্টম পেনাল্টি, যার মধ্যে চতুর্থটি তিনি মিস করলেন। এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে হানেস হালদোরসন, ২০২২ সালে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ভয়চেখ শেজনি এবং চলমান আসরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একটি পেনাল্টি তিনি কাজে লাগাতে পারেননি। এবার মিশরের শোবেইরও তার পেনাল্টি রুখে দেন।
পেনাল্টি মিসের পরও একের পর এক সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। ২৮তম মিনিটে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড সহজেই তালুবন্দি করেন শোবেইর। তিন মিনিট পর প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে মেসির নেওয়া দুর্দান্ত ফ্রি-কিক পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ৩৯তম মিনিটে তাগলিয়াফিকোর কাট-ব্যাক থেকে আলভারেজের প্রথম ছোঁয়ার শটও অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন মিশরের গোলরক্ষক।
দ্বিতীয়ার্ধে পাল্টা আক্রমণে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে মিশর। ৫৮তম মিনিটে সালাহর পাস থেকে জিকো গোল করলেও লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউলের কারণে ভিএআরের সহায়তায় সেটি বাতিল করেন রেফারি।
তবে ৬৭তম মিনিটে আর ভুল করেনি মিশর। দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সালাহ হাসানকে বল দেন। হাসানের কাট-ব্যাক থেকে জিকো সহজ ফিনিশে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর শুরু হয় আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। ৭৯তম মিনিটে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড শোবেইরের গ্লাভসে লেগে জালে জড়ায়। চার মিনিট পর ডি-বক্সে সৃষ্ট জটলার মধ্যে বল পেয়ে প্রথম ছোঁয়াতেই শট নেন মেসি। বল ক্রসবারে লেগে শোবেইরের শরীরে লেগে জালে ঢুকে গেলে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। চলমান বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির অষ্টম গোল।
ইনজুরি সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে মিশরের একটি ফাউলের দাবি উপেক্ষা করে খেলা চালিয়ে যেতে দেন রেফারি। সেই সুযোগে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠে এসে এনজো ফার্নান্দেজ জয়সূচক গোল করেন। ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচে মেসি একটি গোল করেন, একটি গোলে সহায়তা করেন এবং আর্জেন্টিনার নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের অন্যতম প্রধান কারিগর হন। শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ক।
অন্যদিকে ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মিশর। তাদের অভিযোগ, ফ্রান্সের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ভিএআরের সহায়তায় মিশরের একটি গোল বাতিল হলেও নিজেদের পক্ষে করা আপিলগুলো আমলে নেননি তিনি—এমন অভিযোগ করেছে মিশর শিবির।



